লালমনিরহাট প্রতিনিধী

লালমনিরহাট জেলার আদিতমারি উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ক্যাম্পেরটারি সীমান্ত শেষ পর্যন্ত পাচারকারীদের দখলে চলে এসেছে। গতকাল শনিবার গভীর রাতে ঘন কুয়াশা পড়লে পাচারকারী চক্র এই সীমান্তদিয়ে দেড়শতাধিক গরু পাচার করে বাংলাদেশে এনেছে। এর সাথে এসেছে মাদক, বিস্ফোরক, ক্ষুদ্র অস্ত্র, সাউন্ড গ্রেনেড ও গ্রেনেড।

আন্তর্জাতিক সীমান্তের ৯২৪ ও ৯২৬ এখন চোরাকারবারিদের স্বর্গে পরিণত হয়েছে। ৩-৪ বছর আগে এই সীমান্তে বিজিবি সাড়ে কোটি টাকার স্বর্ণের বার আটক করে। এরপর হতে পাচারকারী চক্র নিষ্ক্রিয় ছিল। ক’দিন ধরে রাতে লালমনিরহাটে বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় গরুর পাচারকারী চক্র বাংলাদেশে গরু ও মাদক প্রবেশের জোর চেষ্টা করে আসছিল। কিন্তু ভারত সীমান্তে সান্ধ্য আইন, দেখামাত্র গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড মারার কয়েকটি ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে দু-দেশের সীমান্ত বাহিনীর মধ্যে কয়েক দফা পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সীমান্তের আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়া চক্রের এক সদস্য জানান, ১৯৯২ – ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই সীমান্ত ছিল চোরাকারবারি- দের স্বর্গ রাজ্য। ভারতের অসমের বিচ্ছিন্নতাবাদীর দখলে। যার কারণে ভারত সরকার এই সীমান্তের অদুরে একটি অর্ধশত বছরের পুরনো ইমিগ্রেশন রুট মোগলহাট টি ১৯৯২ বন্ধ ঘোষণা করে। সেই হতে ইমিগ্রেশন রুটটি বন্ধ। সেই সাথে ধীরে ধীরে চোরাচালানী চক্রটিও নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। ২০১৫ সালে এই সীমান্তের জনৈক বেলাল – দুলাল ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদ ভবন চত্বরে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। এই ঘটনাটিতে প্রাণহানির কোন ঘটনা ঘটেনি। তবে ভারতের সংসদ ভবনের নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি আন্তর্জাতিক ভাবে আলোচনায় আসে। ফলে দুর্গাপুর – মোগলহাট সীমান্তের ক’টি পকেট চরাঞ্চলে বিএসএফের কম্বিং অপারেশন হয়। এই অপারেশনের সময় বিজিবিকে সর্তক রাখা হয়েছিল। সেই সময়ে বিজিবির প্রধান মেজর জেনারেল আজিজ আহম্মেদ সীমান্তে এসে পর্যবেক্ষণ করে ছিলেন। সেই অপারেশনে ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, বিস্ফোরক সহ বেশ কয়েকজন আটক করে। তার মধ্যে একজন ছিল মোগলহাটের দুলাল।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পুনরায় সীমান্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছো মাফিয়া চক্রটি। এই চক্রটি পূর্ণ শক্তি অর্জন করতে দূর্গাপুর – মোগলহাট সীমান্তে বেশ কয়েকটি লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটায়। এসব হত্যাকান্ডের মূলে ছিল সীমান্তে আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ। এখন বাংলাদেশের পাশের সীমান্ত পুরো নিয়ন্ত্রণ একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতাদের হাতে। সেই দলের নেতা গণ কয়েক সপ্তাহ আগে কোটি টাকা খরচ করে এমপি মনোনয়ন পেতে বিশাল শো- ডাউন করেছিল। যার অর্থের প্রধান যোগানদাতা আন্ডারওয়ার্ল্ড। এই সীমান্তের কৃষ্ণ মাস্টার প্রধান শেল্টার দাতা। তার বিশাল সম্পদের পাহাড়। তার বাসায় দীর্ঘদিন বিদেশি এক নারী অবস্থান করে ছিল। এমন কি তার বাসায় ডিসি- এসপি প্রমোদ জলসায় অংশ নিয়ে ছিল। গোয়েন্দা সংস্থা নজরদারি বেড়ে গেলে ঐ বিদেশি নারী লাপাত্তা হয়ে যায়। ডিসি এসপি কে বদলি করা হয়। সেই মাফিয়া চক্রটি পুনরায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সক্রিয় হয়েছে।

গতকাল শনিবার রাতে দুর্গাপুর সীমান্তে গভীর রাত গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে সীমান্ত গ্রাম গুলোতে আতস্ক ছড়ায়। পরে কুয়াশায় গ্রামবাসী কাউকে চিনতে পারেনি। তবে দেড় শতাধিক গরু ও পোটলা পার হতে দেখেছে। কয়েকটি গরুর পেট কাটা ও সেলাই করা ছিল। ধারণা করা হচ্ছে গরুর পেটে সাউন্ড গ্রেনেড ও গ্রেনেড আনা হতে পারে। এমন কী উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক হতে পারে।
এদিকে কালীগঞ্জের একটি সূত্রে জানা গেছে, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভারত হয়ে হিরোইন আসত কালীগঞ্জে। মন্ত্রী পুত্রের পুকুরপাড়ের বালাখানায় তাহা মজুদ থাকত। তারপর সেটা মহিষখোচা হয়ে নৌপথে ও সড়ক পথে ঢাকাসহ দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়ত। মন্ত্রীর এপিএস মিজান ও তার স্ত্রী এবং শ্বশুর বাড়ির স্বজনরা নিয়ন্ত্রণ করত। বিশাল মাদকের চালান সহ ডিবি পুলিশের হাতে আটক হয়। এ মাদকের চালান আটকের পর পুলিশ উল্টো বেকায়দায় পড়ে যায়। আবার ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর কালীগঞ্জে মন্ত্রী পুত্রের বালাখানা হতে নগদ অর্থ, বিপুল পরিমাণ হিরোইন ও মাদক লুটপাট হয়ে যায়। বিষয়টি এলাকায় সবার মুখেমুখে। এই আন্ডারগ্রাউন্ড মাফিয়া কানেক্টিভিটির মাধ্যমে মন্ত্রীর এপিএস মিজান ও মন্ত্রী পুত্র রাকিব আন্ত গোপন করে বিদেশে পাড়ি দিয়েছে।

দুর্গাপুর সীমান্তের বিজিবির বিওপি কমান্ডার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সীমান্তে বিজিবি তার সাধ্যমত শক্তি দিয়ে পাহাড়ায় থাকে। ভারতে যেমন কাঁটাতারে বেড়ার পাশে রাস্তা বাংলাদেশের নোম্যান্সল্যান্ডের পাশে রাস্তা নেই। তাই কোথাও কোন ঘটনার কথা শুনলে তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছাতে পারছেনা। পৌঁছাতে পৌঁছাতে পাচারকারী চক্র তাদের কাজ দক্ষতার সাথে শেষ করে। সংখ্যায় পাচারকারী থাকে ১০০ – ৩০০ জন। আমরা টহলে থাকি সর্বচ্চ ১০ জন। ভারতে প্রতি ৩০ মিটার পর পর অস্ত্রধারী বিএসএফ থাকো একজন করে, কোথাও দুই জন করে। তাদের মনিটরিং করতে পিকাপ টহলকারী থাকে। তাদের তুলনায় সবদিক থেকে নেটওয়ার্ক কমিউনিকেশন আমাদের অনেক ক্ষেত্রে দূর্বল।